বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে, রাষ্ট্রের কোনো চাকরিতে নারী পুরুষ সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে বাস্তবে অফিসের দরজা পেরোতে গিয়েই নারীদের সামনে যে অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, তা ভাঙা এখনো দুঃসাধ্য। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, কাজ করার উপযুক্ত বয়সী নারীদের মাত্র প্রায় ৪০ থেকে ৪৩ শতাংশ শ্রমবাজারে আছেন, যেখানে একই বয়সী পুরুষদের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ করেন অনেক নিয়োগদাতা এখনো মনে করেন নারী নিলে “অফিসের পরিবেশ নষ্ট হয়” বা “বিয়ের পর টিকবে না”, ফলে যোগ্য হয়েও অনেক নারী ইন্টারভিউ বোর্ডেই বাদ পড়ে যান। এক জরিপে দেখা গেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা বিশ্বাস করেন নারী কর্মী নিলে কর্মক্ষেত্রে ঝামেলা বাড়ে আর ৯৯ শতাংশ বাংলাদেশি অন্তত এক ধরনের নারীবিরোধী সামাজিক পক্ষপাত পোষণ করেন এই মানসিকতা সরাসরি প্রভাব ফেলে নারীর বেতন, প্রমোশন ও নেতৃত্বের আসনে ওঠার সুযোগের ওপর।
 
কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারলেও নিরাপত্তা আর সম্মানের লড়াই আলাদা করে চলতে থাকে। জাতিসংঘের জেন্ডার ব্রিফ আর সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, যৌন হয়রানি নারীদের কাজ ছেড়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে শুরু করে ব্যাংক, এনজিও, মিডিয়া, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীরা নিয়মিত কটূক্তি, অশোভন প্রস্তাব, শারীরিক স্পর্শ আর ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেওয়ার হুমকির মুখে পড়ছেন তবু অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা নেই, আর থাকলেও অভিযোগ করলে বরং “সমস্যা সৃষ্টিকারী মেয়ে” তকমা গায়ে লাগে। ফলে ২০২৫ সালেও দেখা যায় নারীরা নিম্ন বেতনের “নারী উপযোগী” কাজেই বেশি বন্দি যেমন গার্মেন্টস, টেলিমার্কেটিং, প্রাইভেট টিউশন, কেয়ার ওয়ার্ক আর সিদ্ধান্ত নেওয়া পজিশনগুলো এখনো প্রায় পুরোপুরি পুরুষ দখলে, তৈরি হয় “গ্লাস সিলিং” নামে অদৃশ্য এক ছাদ, যার ওপারে খুব কম নারীরই ওঠা হয়ে ওঠে।
 
এই বৈষম্য কুইয়ার মানুষদের ক্ষেত্রে আরও তীব্র। আন্তর্জাতিক এলজিবিটিআই ডাটাবেস আর ব্রিটিশ হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যৌন অভিমুখীতা বা জেন্ডার আইডেন্টিটির ভিত্তিতে বৈষম্য রোধে কোনো আইন নেই সমলিঙ্গ সম্পর্ক এখনো ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ, আর কর্মক্ষেত্রে এলজিবিটিকিউ মানুষের সুরক্ষার কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, কুইয়ার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে অনেককে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া, প্রমোশন না দেওয়া, বদলি করা বা অঘোষিতভাবে “ব্ল্যাকলিস্ট” করার ঘটনা ঘটে অথচ ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ কাজ হারানোর ভয়ে বেশিরভাগই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পর্যন্ত করতে পারেন না।
 
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে কর্মক্ষেত্রের এই অদৃশ্য দেয়ালগুলোকে দেখি একই সঙ্গে লিঙ্গ, শ্রেণি আর কুইয়ার পরিচয়ের জটিল জালের মতো যেখানে অফিসের দরজার বাইরে যে সমাজ নারীর ঘরের কাজকে “দায়িত্ব” আর পুরুষের আয়কে “উপার্জন” বলে ভ্যালু দেয়, সেই সমাজের মনোভাবই হুবহু ঢুকে বসে বসের রুম, বোর্ড মিটিং আর এইচআর নীতির ভেতরে। আমার মতো কেউ যদি খোলাখুলিভাবে বলে “আমি বাইসেক্সুয়াল”, কিংবা কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার আর কুইয়ার ইনক্লুশনের কথা তোলে, তখন তাকে সহজেই “বেশি তাত্ত্বিক”, “ঝামেলার সোর্স” বা “কালচারাল ফিট না” বলে আড়ালে সরিয়ে দেওয়া যায় সিভিতে তা কখনো লেখা থাকে না, কিন্তু অফিস পলিটিক্সের অদৃশ্য খাতায় বড় করে নোট হয়ে থাকে। আইন বইতে সমতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও যতদিন পর্যন্ত এই অদৃশ্য পক্ষপাত, ধর্মীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আর কুইয়ারদের অপরাধীকরণের কাঠামো বদলানো না যায়, ততদিন নারীদের আর কুইয়ার কর্মীদের জন্য কর্মক্ষেত্র থাকবে আংশিক খোলা দরজার মতো যেখানে ভেতরে ঢোকা যায়, কিন্তু পুরো মানুষ হয়ে দাঁড়ানো যায় না।