২০২৫ সালের প্রাইড মাসেও বাংলাদেশের বাইসেক্সুয়াল মানুষের জন্য বাস্তবতা প্রায় আগের মতোই চোখে ইউটিউবের প্রাইড প্যারেড, হাতে নিজের ফোনের ছোট্ট স্ক্রিন, আর চারদিকে এক অদৃশ্য আতঙ্কের ঘেরাটোপ। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট আর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এলজিবিটিকিউ অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য যতই উচ্চারিত হোক, বাস্তব নীতিমালায় এখনো কোনো সুরক্ষা নেই সমলিঙ্গ সম্পর্ক দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় অপরাধ, বৈষম্য বিরোধী কোনো আইন নেই, আর কুইয়ার বিরোধী সহিংসতা গত তিন বছরে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এক বছরে অন্তত ৩৯৬ জন এলজিবিটিকিউ ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে কেবল একজনকে “বাইসেক্সুয়াল” হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে সংখ্যাটা এত কম কেন, সেটাই আসলে আমাদের অদৃশ্য জীবনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, কারণ অধিকাংশ বাই মানুষই নিরাপত্তার জন্য নিজ পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হয়।
বাইসেক্সুয়াল নারীদের ব্যাপারে ২০২৫ সালের আউটরাইট ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক গবেষণা আর অন্যান্য পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, আমাদের জন্য সহিংসতা অনেক সময় সরাসরি গায়ে লাঠি হয়ে নেমে না এলেও, অনলাইনে যৌন মন্তব্য, ইনবক্সে ব্ল্যাকমেইল, অন্তরঙ্গ ছবি ফাঁসের হুমকি আর “দুইদিকে চলফেরা করা”র অপবাদ হিসাবে প্রতিদিনই হাজির থাকে। অনলাইনে কুইয়ার বা নারীবাদীভাবে লেখালেখি করা লেসবিয়ান ও বাই নারীরা নিয়মিতই লক্ষ্য হন ডক্সিং, রেপ থ্রেট, “ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করে দেব” ধরনের চাঁদাবাজি আর সংগঠিত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর রিপোর্ট ক্যাম্পেইনের অনেকেই এক সময় প্রোফাইল লক করে, পুরনো লেখা মুছে, কিংবা দেশ ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ দেখেন না।
একজন বাইসেক্সুয়াল নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে প্রাইড মাস আমার কাছে তাই রঙিন উত্সবের চেয়ে বেশি এক অদৃশ্য থাকার অনুশীলন অফিসে, পরিবারে, পুরুষ সঙ্গীর সামনে, নারী প্রেমিকার নিরাপত্তার কথাও মাথায় রেখে, বারবার নিজের কথা সামলে বলা। বাই হওয়ার মানে এখানে প্রায়ই “বিভ্রান্ত”, “চরিত্রহীন” বা “লোভী” তকমা কাঁধে নিয়ে বাঁচা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি মনে করে, একজন নারী যদি পুরুষ আর নারী দুজনকেই ভালোবাসতে পারে, তাহলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন, তাই তার সম্পর্ক, পোশাক, চলাফেরা সবকিছুর ওপরই বাড়তি নজরদারি চলে। প্রাইডহীন এই প্রাইড মাসে কখনো কখনো মনে হয়, হয়তো কোনোদিন সত্যি রাস্তা ভরে যাবে রংধনু পতাকায় আর সেই ভিড়ের ভেতরে আমিও বুক উঁচু করে বলতে পারব “হ্যাঁ, আমি একজন বাই নারী” কিন্তু ততদিন পর্যন্ত প্রতিটা জুনই কেটে যাবে আন্ডারগ্রাউন্ডে, নিজের ছোট্ট নিরাপদ বৃত্ত আর অসংখ্য অনুচ্চারিত ভালোবাসার গল্প নিয়ে।