কাউকে ভালোবাসা কি সত্যিই অপরাধ হতে পারে? যুক্তি দিয়ে ভাবলে উত্তরটা সহজ, না। কিন্তু বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্র, তার উপনিবেশিক আইন, আর আমাদের সমাজের ভণ্ডামি মিলে ভালোবাসাকে এমনভাবে অপরাধ বানিয়ে রেখেছে, যেন দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিছানায় কী করবে, সেটার ওপরই জাতির ইমান আকিদা, সংস্কৃতি আর সভ্যতা টিকে আছে। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা, যেটা ব্রিটিশ আমলে বানানো “unnatural offences” এর আইন, আজও এই দেশে সমকামী, উভকামী, কুইয়ার মানুষদের গায়ে ঝুলে থাকা এক অদৃশ্য ফাঁসির দড়ি। “যে কেউ স্বেচ্ছায় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে কোনো পুরুষ, নারী বা প্রাণীর সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হলে”, তার সাজা যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা। কাগজে লেখা আছে “man, woman or animal”, মানে যে কোনো অ হেটারোসেক্সুয়াল যৌন আচরণই নাকি প্রকৃতির বিরুদ্ধে। কতটা বিকৃত হলে রাষ্ট্র মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাণীর সমতুল্য করে রাখে, আর সেই মানসিকতা নিয়েই শত বছর পরও আইনটা অক্ষত রাখে, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।
অনেকেই বলে, “আরে আইনটা আছে বটে, কিন্তু কে আর আজকাল সমকামীদের ধরে জেলে ভরে?” এই যুক্তিটা এমন এক ধরনের gaslighting, যেটা শুধু কাগজের মামলা দিয়ে ভয় দেখানোর বদলে প্রতিদিনের জীবনে কুইয়ার মানুষদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। আন্তর্জাতিক আর দেশীয় তথ্য উপাত্ত স্পষ্ট বলছে, ৩৭৭ ধারায় সরাসরি দণ্ডিত হোক বা না হোক, আইনটা পুলিশের হাতে একটা স্থায়ী অস্ত্র সমকামী, উভকামী, ট্রান্স বা “মেয়েলি” ভঙ্গীর পুরুষদের আটক করা, হুমকি দেওয়া, ঘুষ আদায় করা, তাদের মিটআপ, পার্টি বা সাপোর্ট গ্রুপ ভেঙে দেওয়ার জন্য এই ধারাটাকে ও সম্পর্কিত অন্যান্য ধারাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিউম্যান ডিগনিটি ট্রাস্ট আর ব্রিটিশ হোম অফিসের রিপোর্টগুলোতে লেখা আছে, ৩৭৭ ধারা “very rarely prosecuted” হলেও, এর অস্তিত্বই একটা তীব্র homophobic পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে পুলিশ ও অন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী “প্রকৃতির বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক” এর অভিযোগ দেখিয়ে কুইয়ার মানুষদের হয়রানি, নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল করে।
২০২৩ সালের দিকে যে সব খবর বেরোল, কোনও জায়গায় “অনৈতিক কার্যকলাপের আড্ডা” নামে কুইয়ার তরুণদের গ্রেপ্তার, কোথাও পার্টিতে হানা দিয়ে “অশ্লীলতা”র অভিযোগ, আবার কোথাও “unnatural offence” এর মামলার ভয় দেখিয়ে ইনফরমাল কাস্টডি, মারধর, পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি, এসব আসলে এই একই ধারার ছায়ায় ঘটে। ভালোবাসার সম্পর্ক, যা হওয়ার কথা ছিল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়, তা হঠাৎ করে “জাতির নৈতিকতা ধ্বংসকারী” অপরাধে পরিণত হয়। মজার বিষয়, এই ৩৭৭ ধারা শুধু কুইয়ার পুরুষদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, কাগজে যদিও “man, woman or animal” লেখা, বাস্তবে এর নিশানা মূলত পুরুষ পুরুষ সম্পর্ক মহিলা মহিলা যৌনতা নিয়ে আইন প্রায় চুপ, কিন্তু সমাজ চুপ না, পরিবার চুপ না, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চুপ না।
আমি নিজে একজন উভকামী নারী। আমার প্রথম মেয়ের প্রতি প্রেমের কথা মনে আছে, ১২ বছরের আমি, ঢাকা শহরের এক কোচিংয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে আছি, পাশে বসে থাকা মেয়েটার হাত স্পর্শ করতেই বুকের ভেতরে তীব্র কাঁপুনি। সেই অনুভূতি যে কতটা সুন্দর, কতটা সত্যিকারের, তা ভাষায় বোঝানো যায় না। অথচ সেই ভালোবাসাই এই রাষ্ট্রের চোখে “প্রকৃতির বিরুদ্ধে”, “অপবিত্র”, “অপরাধ”, এই ভাবনাটা আমাকে ভেঙে দিয়েছিল। তাই বলেই তো প্রকাশ করতে পারিনি, পরিবার থেকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে, “ফ্রেন্ড” শব্দের আড়ালে প্রেমিকার কথা বলতে হয়েছে। আমার বর্তমান কুইয়ার পরিচিতির ভেতরে এই ভয়ের ছাপ আজও আছে, আমি বিদেশে থাকি বলে হয়তো পুলিশ এসে দরজা ভাঙবে না, কিন্তু নিজের দেশের মাটিতে পা দিলেই ৩৭৭ এর নীরব দৃষ্টি যেন আমার সব সম্পর্কের ওপর নজর রাখে।
এইসব ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সমাজের ভণ্ডামিটা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একদিকে ভারত, নেপাল, ভুটান, একই উপনিবেশিক ৩৭৭ এর উত্তরসূরি দেশগুলো নিজেদের সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে, সংসদ দিয়ে, সামাজিক আন্দোলন দিয়ে এই আইনের দাঁত ভেঙেছে ভারতে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিমূলক সম্পর্ক অপরাধ হতে পারে না, ৩৭৭ এর ঐ অংশ অসাংবিধানিক। আর বাংলাদেশে আমরা এখনও গর্ব করে বলি, “আমাদের এখানে তো এইসব অশ্লীলতা চলে না”, “আমাদের সমাজে এসব মানা হয় না।” সরকার, মানবাধিকার কমিশন, কেউই ৩৭৭ বাতিলের প্রশ্নে মুখ খোলে না আন্তর্জাতিক রিপোর্টে smooth ভাষায় লেখা থাকে, “Section 377 is not actively enforced, but is retained due to societal pressure”, মানে সমাজের homophobia কে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্র আইনটাকে টিকিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ, সংখ্যাগুরুদের ঘৃণাকে রক্ষা করার জন্য সংখ্যালঘুদের ভালোবাসাকে অপরাধ বানিয়ে রাখা হয়েছে।
অনেকেই বলে, “তোমরা গোপনে ভালোবাসো, রাষ্ট্র তো এসে কোনো দরজা ভাঙছে না, সমস্যা কী?” এই যুক্তি শুনলেই বুঝি, কতটা privilege থেকে কথা বলা হচ্ছে। যারা hetero, তারা হয়তো সহজেই বিয়ে করে, হাত ধরে হাঁটে, ছবি পোস্ট করে সমাজও তাদের “প্রাকৃতিক” বলে আদর করে। কুইয়ার মানুষদের ক্ষেত্রে একই রাষ্ট্র “গোপনে থাকো” কে নিরাপত্তা হিসেবে বিক্রি করে। কিন্তু কুইয়ার হওয়া মানে তো কেবল বিছানায় কাকে কাছে টেনে নেবো, এই প্রশ্ন না মানে বন্ধু পরিবারের কাছে নিজের সত্তা খুলে বলতে পারা, relationship কে স্বাভাবিকভাবে বাঁচানো, বাড়ি ভাড়া নেওয়া, কাজ করতে যাওয়া, ডাক্তারের কাছে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া। ৩৭৭ এর মতো আইন থাকলে, পুলিশের হাতে সে একটি perpetually negotiable threat হয়ে ওঠে, “আমরা চাইলে তোমার বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারি, তাই চুপ করে থাকো।” এটা আইন নয়, perpetual blackmail।
এখানে আমাদের নারীবাদী আন্দোলনেরও জবাবদিহি আছে। বহু নারীবাদী সংগঠন এখনও “LGBT” শব্দটা মুখে আনতে নারাজ, “সংবেদনশীল”, “ধর্মীয় সমাজ”, “মুভমেন্ট দুর্বল হয়ে যাবে”, এই অজুহাতে কুইয়ার প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যায়। অথচ ৩৭৭ শুধু gay পুরুষের বিরুদ্ধে না, পুরো যৌন মানবিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। এই আইন নারী পুরুষের consensual anal বা oral sex কেও অপরাধ বানায় মানে hetero দম্পতিও যদি “প্রকৃতির বিরুদ্ধে” কিছু করে, সেটা তত্ত্বগতভাবে শাস্তিযোগ্য। তবু আইনটা টিকিয়ে রাখা হয়েছে শুধু queer phobia কে legitimize করার জন্য। নারীবাদ যদি সত্যি শরীরের স্বাধীনতা, আকাঙ্ক্ষার স্বাধীনতা, ভালোবাসার স্বাধীনতার কথা বলে, তাহলে ৩৭৭ এর বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে তা পূর্ণতা পায় না।
“ভালোবাসা যখন অপরাধ”, এই বাক্যটা শুনতে খুব romantic লাগতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটা খুবই নির্দিষ্ট এবং হিংস্র বাস্তবতা। ২০১৬ সালে দুইজন সমকামী অধিকারকর্মী, জুলহাজ মান্নান আর তন্ময়, হত্যার পর থেকে কুইয়ার কমিউনিটির অনেকেই দেশ ছেড়েছে, অনেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে, অনেক গ্রুপ বন্ধ হয়ে গেছে পুলিশ, রাষ্ট্র, আদালত কেউই আমাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে পারেনি। এরপর যখনই কোনো “unnatural offence” এর মামলা বা নজির তৈরির খবর দেখি, মনে হয়, এই রাষ্ট্র আমাদের ভালোবাসাকে শুধু অপরাধই না, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখছে। একদিকে হিজড়াদের ভোটার আইডি, পাসপোর্টে থার্ড জেন্ডার স্বীকৃতির গল্প অন্যদিকে সমকামী সম্পর্ক থাকলে সেই সম্পর্কের ওপর ৩৭৭ ঝুলে থাকে, এটাই আমাদের ভণ্ডামি।
সেপ্টেম্বার ২০২৩ এর প্রেক্ষিতে আমি তাই শুধু একটা দাবিই দেখি, এই ৩৭৭ নামের বিষদাঁত ভেঙে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। আইন থাকলে তা অপব্যবহার হবেই “না ব্যবহার” করে রেখে দেওয়া মানে ভবিষ্যতের দমনপীড়নের জন্য মজুদ রাখা। ৩৭৭ বাতিল মানে শুধু gay rights না, মানে এই রাষ্ট্র স্বীকার করছে যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিমূলক সম্পর্ক তার নিয়ন্ত্রণের বিষয় না। ভালোবাসাকে অপরাধ বানিয়ে যে দেশ নিজেকে নৈতিক ভাবে উচ্চ ভাবতে চায়, তার চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?
এই ভণ্ডামি ভাঙার কাজটা আইনপ্রণেতাদের হাতে, কিন্তু তার শুরুটা আমাদের গলায়, যেখানে আমরা স্পষ্টভাবে বলি, “কাউকে ভালোবাসা অপরাধ না, অপরাধ হল সেই ভালোবাসাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।” যতদিন পর্যন্ত ৩৭৭ আমাদের বইয়ে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের প্রেমের ওপর, শরীরের ওপর, পরিচয়ের ওপর রাষ্ট্রের এই কুৎসিত নজরও থাকবে। আর যতদিন সেই নজর থাকবে, ততদিন বাংলাদেশের আকাশে ভালোবাসা সবসময়ই একটু অপরাধবোধ মিশিয়ে নিঃশ্বাস নেবে।