বিশ্বের নানা শহরে জুন এলেই রঙিন পতাকা আর প্রাইড প্যারেডে ভরে যায় রাস্তা কিন্তু ঢাকায় এই মাস মানে আমাদের অনেকের জন্য আরেকটু বেশি ভয়, আরেকটু বেশি আন্ডারগ্রাউন্ড। ভয়েস অফ আমেরিকা জুন ২০২৪ এ লিখেছিল বাংলাদেশের সমকামী বা কুইয়ার মানুষদের জন্য প্রাইড মানে এখন মূলত ফোনের স্ক্রিনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বন্ধ গ্রুপে ভার্চুয়াল পার্টি, নেটফ্লিক্সে কুইয়ার সিরিজ দেখা, আর অনেকটা সময় সোশ্যাল মিডিয়ার হেট কমেন্ট এড়িয়ে চলা রাস্তায় পতাকা নিয়ে নামার স্বপ্নটা বহু আগেই থেমে গেছে জুলহাজ তনয়ের হত্যাকাণ্ড আর রেইনবো র্যালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে। সমলিঙ্গ সম্পর্ক এখনো দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় অপরাধ, এলজিবিটিকিউ বিষয়ক কার্যক্রম পুলিশ ও গোয়েন্দাদের রাডারে, আর প্রকাশ্যে পরিচয় জানিয়ে প্রাইড উদযাপন করলে তা “অস্বাভাবিক যৌনাচার” আর “ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ” হিসেবে সহিংসতা ডেকে আনতে পারে এই বার্তাই কুইয়ার কমিউনিটির গভীরে গেড়ে বসে আছে।
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের ২০২৪ সালের বার্ষিক রিপোর্ট বলছে এক বছরেই ৭০টি নথিভুক্ত ঘটনায় কমপক্ষে ৩৯৬ জন এলজিবিটিকিউ ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়েছে ২০২২ সালে যেখানে ২০৪ জন আর ২০২৩ এ ২১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, সেখানে ২০২৪ এ এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এই ৩৯৬ জনের মধ্যে ২৩ জন লেসবিয়ান নারী, ১১২ জন গে পুরুষ, ১ জন বাইসেক্সুয়াল, ১ জন ইন্টারসেক্স আর ২৬৯ জন ট্রান্স/হিজড়া মানুষ সহিংসতার ধরন খুন, মারধর, আত্মহত্যা, পুলিশি গ্রেপ্তার, ভুয়া মামলা, চাকরি থেকে তাড়ানো, বাসা ব্যবসায় হামলা, ব্ল্যাকমেইল আর মৃত্যুহুমকি পর্যন্ত বিস্তৃত। একই সময়ে ভয়েস অফ আমেরিকা আর অন্য মিডিয়ার প্রতিবেদনে এসেছে, অনেক কুইয়ার তরুণ এখন প্রাইড মানে শুধু ভিপিএন দিয়ে ইউটিউবে অন্য দেশের প্রাইড দেখাকে বোঝে, নিজের শহরে সে জানে রংধনু পতাকা গলির মোড়ে নিয়ে দাঁড়ালে প্রথমেই ছবি তুলে ফেসবুক লাইভে “অশ্লীলতা বিরোধী জিহাদ” ডেকে বসবে কেউ।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে প্রাইড মাসে নিজের জন্য আলাদা কোনো উৎসব খুঁজে পাই না বরং অনুভব করি এই মাসটা যেন আরও বেশি করে মনে করিয়ে দেয় কতটা অদৃশ্য হয়ে বাঁচতে বাধ্য হয়েছিলাম। অন্য দেশের প্রাইড মিছিলের ভিডিও দেখে বুকের ভেতর কোথাও ঈর্ষা আর শূন্যতা দুটোই কাজ করে কারণ বাংলাদেশের LGBTQ সম্প্রদায়ের মানুষেরা এভাবে প্রাইড মিছিল করতে পারে না। কতটা অসহায় এসকল মানুষ। তারপরই মনে পড়ে আমার শহরে এখনো হাত ধরাধরি করে হাঁটতে গেলে, বা দুজন মেয়ে মিলে ছবি তুললে, কত সহজেই সেটাকে “পাপের কাজ” বলে ভাইরাল করে দেওয়া যায়। প্রাইডের ভাষায় বলা হয় “লাভ ইজ লাভ” কিন্তু বাংলাদেশি কুইয়ারদের বাস্তবে প্রাইড মানে এখনো “লাভ ইজ সিক্রেট অ্যান্ড হিডেন” ভয়ের ভেতরে লুকিয়ে রাখা এক সম্পর্ক, যাকে প্রকাশ করার অধিকার এখনো নেই পরিবার, আইন, ধর্ম আর রাষ্ট্রের সেই যৌথ কারাগারে।